ঢাকা , বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬ , ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে সীসা দূষণ: অর্থনীতির জন্য নীরব হুমকি

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৬-১৬ ২৩:৩৮:০৮
বাংলাদেশে সীসা দূষণ: অর্থনীতির জন্য নীরব হুমকি বাংলাদেশে সীসা দূষণ: অর্থনীতির জন্য নীরব হুমকি
খুকৃিবি প্রতিনিধি:

মোঃ রাজিবুল হোসেন তানিম বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সীসা দূষণপ্রবণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত। বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সীসা দূষণ দেশের জনস্বাস্থ্য, শিশুদের মানসিক বিকাশ এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লক্ষ শিশু সীসা দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে, যা মোট শিশুর প্রায় ৬০ শতাংশ। পিওর আর্থ ও ইউনিসেফের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন “টক্সিক ট্রুথ (২০২০)” অনুসারে, বাংলাদেশে সীসা বিষক্রিয়া একটি নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সীসার প্রভাবে শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের আইকিউ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

একই সঙ্গে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক হৃদরোগজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করছেন, যার সঙ্গে সীসা দূষণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, সীসাজনিত স্বাস্থ্যগত ক্ষতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ২৮.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৬ থেকে ৯ শতাংশের সমান। বাংলাদেশে সীসা দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে অনানুষ্ঠানিক সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি পুনঃচক্রায়ণ শিল্পকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ব্যবহৃত ব্যাটারি ভেঙে সীসা সংগ্রহ ও গলানোর কাজ অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশগত নিরাপত্তা ছাড়াই পরিচালিত হয়। এর ফলে বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং বর্জ্য মাটি ও পানিকে দূষিত করে। এছাড়া সীসাযুক্ত রং, খাদ্যে ভেজাল, নিম্নমানের রান্নার পাত্র, সিরামিক সামগ্রী, শিশুদের খেলনা, ই-বর্জ্য এবং কিছু প্রসাধনী সামগ্রীও সীসা দূষণের উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একসময় হলুদ গুঁড়ায় রঙ উজ্জ্বল করতে সীসাযুক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ঘটনা ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।

তবে সরকারি নজরদারি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত পরীক্ষার ফলে ২০২৩ সালে হলুদে সীসা দূষণের মাত্রা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে, যা একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, সীসা মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মস্তিষ্কের বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে, যার ফলে শেখার ক্ষমতা কমে যায়, আচরণগত সমস্যা দেখা দেয় এবং আইকিউ হ্রাস পায়।

গর্ভবতী নারীদের শরীরে সীসার উপস্থিতি অনাগত শিশুর স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, মানুষের রক্তে সীসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই; অতি সামান্য পরিমাণ সীসাও দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। সম্প্রতি পিওর আর্থ বাংলাদেশ, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং আইসিডিডিআর,বি যৌথভাবে দেশের চারটি জেলায় ৫০০ গর্ভবতী নারী ও ৮৯৮ শিশুর রক্ত পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নমুনায় সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বর্তমানে নমুনাগুলোর একটি অংশ উন্নত প্রযুক্তি GFAAS পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীসা দূষণ নিয়ন্ত্রণে দূষণের উৎস চিহ্নিত করে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি পুনঃচক্রায়ণ শিল্পকে পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা, সীসাযুক্ত রং ও ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ এবং দূষিত এলাকা পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তে সীসার মাত্রা নির্ণয় এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।

সরকার, ইউনিসেফ, পিওর আর্থসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ২০৪০ সালের মধ্যে সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। কার্যকর আইন প্রয়োগ, শিল্পখাতে জবাবদিহিতা এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সীসা দূষণের ভয়াবহ প্রভাব থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। সীসা দূষণ শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এ সমস্যা মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ